Logo
প্রিন্ট এর তারিখঃ ৩ নভেম্বর, ২০২৬, ৪:২৫ AM || প্রকাশের তারিখঃ ২১ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৩৫ AM

শিক্ষক থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে: মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রা

News Image

ফুলতলা প্রতিনিধি: আবু সাঈদ আকাশ


বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু মানুষের পথচলা কেবল পদ-পদবির ধারাবাহিকতা নয়; বরং তা হয়ে ওঠে সময়, সংকট, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক দীর্ঘ ইতিহাস। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনও তেমনই এক দীর্ঘ অভিযাত্রার নাম—ছাত্ররাজনীতি থেকে শিক্ষকতা, শিক্ষকতা থেকে সক্রিয় রাজনীতি, তৃণমূলের নেতৃত্ব থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যাওয়ার পথ।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া মির্জা ফখরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে রাজনীতির সঙ্গে তাঁর পরিচয় আরও আগে। ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্বে ছিলেন এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণও করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৭২ সালে তিনি বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক হিসেবে তিনি যেমন শিক্ষার্থীদের কাছে পরিচিত ছিলেন, তেমনি সময়ের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা ও কর্মকাণ্ডও তাঁকে বৃহত্তর রাজনৈতিক অঙ্গনের দিকে নিয়ে যায়।
১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে সরে এসে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর তৃণমূল রাজনৈতিক নেতৃত্ব আরও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৯২ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন। এরপর ধাপে ধাপে দলের নির্বাহী কমিটি, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে মহাসচিবের দায়িত্বে পৌঁছান।
কিন্তু পদে উন্নীত হওয়ার এই ইতিহাসের আড়ালে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতা। বিরোধী রাজনীতির দীর্ঘ সময়ে বিএনপির ওপর দমন-পীড়ন, মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক চাপের যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল, মির্জা ফখরুলও তার বাইরে ছিলেন না। বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছে। ২০২২ সালের ৭ ডিসেম্বর নয়া পল্টনের বিএনপি কার্যালয় ঘিরে পুলিশের অভিযানের সময়ও তাঁকে কার্যালয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি; একই ঘটনায় দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ বহু নেতাকর্মী আটক হন।
দুঃসময়ের সেই দিনগুলোতে নয়া পল্টনের দলীয় কার্যালয় ছিল বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিরোধের অন্যতম প্রতীক। যখন অনেক পরিচিত মুখকে নিয়মিতভাবে কার্যালয়ে পাওয়া যেত না, তখন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, রুহুল কবির রিজভীসহ হাতে গোনা কয়েকজন নেতাকে দলীয় কর্মসূচি, সংবাদ সম্মেলন ও রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে সামনে থাকতে দেখা যেত। তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান, গ্রেপ্তার, মামলা ও নানা চাপের মধ্যেও দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা বিএনপির দীর্ঘ বিরোধী রাজনৈতিক অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ২০১১ থেকে শুরু। তিনি প্রায় পাঁচ বছর দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে দলটির অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি সরকারের কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। অর্থাৎ তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পরিধি শুধু বিরোধী রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও তাঁর রয়েছে।
আজ তাঁর রাজনৈতিক জীবনের দিকে ফিরে তাকালে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়টি হলো—এই পথ কোনো একদিনে তৈরি হয়নি। ছাত্ররাজনীতির উত্তাল দিন, শ্রেণিকক্ষের শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, তৃণমূলের রাজনীতি, পৌর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব, সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী হওয়া, দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে মহাসচিবের পদ এবং দীর্ঘ বিরোধী রাজনৈতিক সংগ্রাম—সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক পরিচয়।
একজন শিক্ষক যখন রাজনীতির মাঠে নামেন, তখন তাঁর সঙ্গে থাকে শ্রেণিকক্ষের অভিজ্ঞতা; আর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যখন তিনি দলের শীর্ষ নেতৃত্বে পৌঁছান, তখন তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয় সময়ের অসংখ্য সাক্ষ্য। মির্জা ফখরুলের জীবন তাই কেবল একজন রাজনীতিকের জীবনকথা নয়—এটি বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক উত্থান-পতন, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং ক্ষমতা ও বিরোধিতার পালাবদলেরও একটি প্রতিচ্ছবি।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে তাঁর অভিষেক চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলেই তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রার এক নতুন অধ্যায় হয়েছে। শিক্ষকতার শ্রেণিকক্ষ থেকে বঙ্গভবনের দরজা পর্যন্ত এই যাত্রা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে স্থান পেয়েছে।